এনাকোন্ডা নয় অজগর আমার বিস্ময় – ডাঃ নাজমুল হুদা

প্রাণিসম্পদ

শিশুদের শিক্ষা শুরুই হয় বন্য প্রাণি দিয়ে । বাংলা বর্ণমালা শিখতে গিয়ে পড়ে অ-তে অজগর । ইংরেজী বর্ণমালা শিখতে গিয়ে পড়ে A for Anaconda. কাকতালীয় বা পরিকল্পিত যাই হোক দুইটি বন্যপ্রাণিই সাপ । দৈহিক আকৃতি, আচরণ, খাদ্যাভ্যাস, জীবন যাপন ইত্যাদিতেও রয়েছে সাদৃশ্য । ইন্টারনেট, ইউটিউব এর যুগে ভারচুয়ালি শিশুরা এনাকোন্ডা এবং অজগর দুটোই দেখে থাকে । এনাকোন্ডা আকার আকৃতিতে বড় হওয়াতে সব শিশুদের দৃষ্টি এনাকোন্ডার দিকে । চিড়িয়াখানায় এসেও এনাকোন্ডা খুঁজে । উদাহরণ দিই । আমার বন্ধু ড. জুবাইদুল কবির বাধন এর মেয়ে সুদূর রংপুর থেকে দুইবছর আগে জাতীয় চিড়িয়াখানা ঘুরতে এসেছিল । বারে বারেই বলছিল ” আংকেল এনাকোন্ডা দেখান । ” অজগরের দিকে দৃষ্টি না থাকায় আমি কিঞ্চিত ব্যথিত । কারণ অজগর একটি বাংলাদেশী বন্য প্রাণি । অপর দিকে এনাকোন্ডা একটি আমাজন স্পিসিস । অর্থ্যাৎ দক্ষিণ আমেরিকার Bolivia, Brazil, Colombia, Ecuador, French Guiana , Guyana, Peru, Suriname, and Venezuela এর রেইন ফরেস্টের বাসিন্দা হচ্ছে এনাকোন্ডা ।
02.

বিশ্ব সেরা এই সর্পের অবস্থান কোথায় ?
Squamata অর্ডারের অন্তর্ভূক্ত Boidae পরিবারের সদস্য এনাকোন্ডা । বোইডি পরিবারের সকল সাপকে বোয়া (Boa) বলা হয় । সে মোতাবেক এনাকোন্ডা একটা বোয়া । আর কিকি বোয়া থাকতে পারে ? বোয়া কনস্ট্রিক্টর (Boa Constrictor) নামে এক প্রকার বোয়া আছে । অন্যান্য বোয়াদের মধ্যে Amazon Tree Boa, Brazilian Rainbow Boa, Hog Island Boa, Emerald Tree Boa উল্লেখ্য । এত বোয়ার ভীড়ে এনাকোন্ডার পরিচিতি বিশ্ব জুড়ে । ১৯৯৭ সালে আমাজন রেইন ফরেস্টে ধারণকৃত একটি এডভেঞ্চার হরর ফিল্মের নাম ছিল এনাকোন্ডা । লুইস লিওসা পরিচালিত এবং জেনিফার লুপেজ অভিনিত মার্কিন ফিল্ম ডকুন্টারির টপিক ছিল গ্রীন এনাকোন্ডা শিকার । বিশ্ব সাড়া জাগানো ফিল্মের বেশ কয়েকটি সিরিজও বের হয়েছে ।

  1. Livescience . com এর তথ্যমতে এনাকোন্ডা সাপের চারটি প্রজাতি বিদ্যমান । এগুলো হচ্ছে Paraguayan Anaconda, Bolivian Anaconda, Dark Spotted Anaconda এবং Green Anaconda । এই গ্রীন এনাকোন্ডাই হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সাপ, । ওজনের দিক থেকে প্রথম এবং দৈর্ঘ্যের দিক থেকে দ্বিতীয় । দৈর্ঘ্য ২০-৩০ ফুট এবং ওজন প্রায় ২৫০ কেজি । এনাকোন্ডাদের ওয়াটার বোয়াও বলা হয় । বিশালাকৃতির কারণে ডাঙার চেয়ে জলে তারা দ্রুতগতি সম্পন্ন । আমাজন নদীতে এরা মানুষকেও প্যাঁচিয়ে ধরে ।

04.

অজগরের সাথে সাদৃশ্য :
সবাই কনস্ট্রিক্টর । অর্থ্যাৎ শিকারকে প্যাচ দিয়ে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করে । মৃত শিকারকে আস্ত গলাধকরণ করে । এরা নির্বিষ , নিশাচর, ক্লোয়াকাল রিজিয়নে স্পার থাকে । এরা নি:সঙ্গভাবে চলাফেরা করে । শুধু প্রজননকালে একত্রিত হয় । স্ত্রী প্রাণিটি পুরুষের চেয়ে বড় হয় । ভারী দেহ ।

05.
অজগরের সাথে বৈসাদৃশ্য ।

অজগর জল, স্থল এমনকি গাছেও থাকে । স্থলভাগটা সে বেশী পছন্দ করে কিন্তু এনাকোন্ডা জলভাগটা বেশী পছন্দ করে । এনাকোন্ডা প্রিডেটরকে ফাঁকি দেয়ার জন্য জলে নেমে যায় কিন্তু পাইথন তার স্যান্ড গ্ল্যান্ড ( Located Behind Cloaca) থেকে পঁচা গন্ধ বের করে কুন্ডলি পাাঁকিয়ে বসে থাকে শ্বাস প্রশ্বাস বন্ধ করে । যাতে প্রিডেটর মৃত মনে করে এড়িয়ে চলে । এনাকোন্ডার আয়ুষ্কাল জঙ্গলে অজগরের চেয়ে কম (১০ বছর) । স্ত্রী এনাকোন্ডা লার্ভা পাড়ে (Viviparous)। প্রায় দুই Feet দীর্ঘ লার্ভা জন্মের একঘন্টার মধ্যেই খাদ্যগ্রহণ করতে পারে যা অজগরের বাচ্চা পারে না । অজগরের বাচ্চা জন্মের পর অন্তত দুই মাস খাদ্যগ্রহণ করে না । সর্বশেষ যৌন মিলনের পর সাত মাস সময় লাগে এনাকোন্ডার বাচ্চা প্রসব করতে । অপরদিকে ডিম ফুটানোর জন্য ডিম প্যাচিয়ে বডি মাসবকুলেচার মধ্যে কৃত্রিম ঝাঁকুনি তৈরী করে ইনকিউবেশন তাপমাত্রা বজায় রাখে অজগর । এই সময়ের মধ্যে (৬০-৯০ দিন) মা অজগর যেমন খায়না তেমনি পুরো গর্ভাবস্থায় স্ত্রী এনাকোন্ডা বেবিদের নিরাপত্তার জন্য শিকার করে না । অর্থ্যাৎ সাত মাস না খেয়ে থাকে ।

06.

পাইথনের কথায় আসি । এই কমিউনিটিতে কারা আছে ? স্কোয়ামাটা অর্ডারে পাইথনিডি (Pythonidae) পরিবারের সকল সদস্যকেই পাইথন বলা হয় । এরা আফ্রো-এশিয়ান সাপ । অষ্ট্রেলিয়াতেও পাওয়া যায় । সুতরাং Old World Snake বলাই যায় । রেপটাইল ডাটাবেজ এর তথ্যমতে ৪১ প্রজাতির পাইথন আছে পাইথনিডি পরিবারে । আইটিআইএস (Integrated Taxonomic Information System) এর ট্যাক্সোনমি অনুসারে মোট ৮ টি Genus আছে পাইথন পরিবারে । এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে Antaresia, Apodora, Liasis, Morelia, Leiopython ইত্যাদি । তবে Python নামক একটি স্বতন্ত্র জেনাস আছে যার অধীনে সাতটি প্রজাতি আছে । আমরা পাইথন বলতে যেন এই সাত প্রজাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকি ।

07.

আমাদের পাইথনের কথায় আসি । মানে ইন্ডিয়ান পাইথন এবং রেটিকুলেটেড পাইথন । দুই ধরনের ইন্ডিয়ান পাইথন আছে । সবচেয়ে বড়টি হচ্ছে বার্মিজ পাইথন এবং তুলনামুলক ছোটটি হচ্ছে ইন্ডিয়ান রক পাইথন । Python molurus স্পিসিস এর সাব স্পিসিস হিসাবে বার্মিজ পাইথন এবং ইন্ডিয়ান রক পাইথনকে বর্ননা করা হয়েছে । তবে বর্তমানে বার্মিজ পাইথন এবং রক পাইথন আলাদা স্পিসিস হিসাবে Red List of Bangladesh এ উল্লেখ করা হয়েছে । সিলেটের বনাঞ্চল, পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং সুন্দরবন অঞ্চলেই বিচরণ করে পাইথন । পাইথনের সাতটি প্রজাতির মধ্যে Reticulated Python অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । এটি পৃথিবীর ২য় বৃহত্তম সাপ তবে দৈর্ঘ্যের দিক থেকে প্রথম ( (সর্বোচ্চ দৈর্ঘ্য ৩২ ফুট ) । পৃথিবির দির্ঘতম সাপটিও বাংলাদেশে পাওয়া যায় । এতে আমরা গর্ববোধ করি ।

  1. বানিজ্যিক পাইথন খামারে বার্মিজ পাইথন এবং রেটিকুলেটেড পাইথন ব্যবহৃত হচ্ছে । এর পর আছে বল পাইথন (Ball Python) । বল পাইথনকে রয়েল পাইথনও বলা হয় । রয়াল পাইথন সাব সাহারান আফ্রিকাতে পাওয়া যায় । আফ্রিকান পাইথনদের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পাইথন হচ্ছে আফ্রিকান রক পাইথন । আফ্রিকান রক পাইথন আফ্রিকার সর্ববৃহৎ সাপ । মেজাজ চড়া । অপ্রত্যাশিত আচরণ যে কোন সময় করে বিধায় তাদের হ্যান্ডলিং একটু কঠিন । এছাড়াও আছে Angolan Python, Sumatran Blood Python, Timor Python ইত্যাদি ।
  2. আবদ্ধ অবস্থায় পাইথনের Metabolic Bone Disease, , Infectious Stomatitis, Submandibular Cellulitis, Necrotic Dermatitis, Respiratory Tract Infection, Ascariasis, Cryptosporidiosis, Inclusion Body Disease (IBD) ,Nidovirus infection, Septicemia, ইত্যাদি ধরণের ব্যাধি দেখা যায় । IBD সংক্রমনে স্নায়বিক লক্ষন দেখা দেয় । মুভমেন্ট কম থাকে, মুখে ঘাঁ হয়, নিউমোনিয়া থাকে, খাদ্য বমি করতে পারে ।চিকিৎসায় সুফল আসে না ।

পাইথনের রোগ নির্ণয়ের জন্য নমুনা সংগ্রহ থেকে শুরু করে ড্রাগ নির্বাচন, রেজিমেন, প্রয়োগ পদ্ধতি একেবারে ম্যামালিয়ান প্রজাতির চেয়ে আলাদা । তাদের এনাটমি ও ফিজিওলজি ভিন্ন হওয়ায় পদ্ধতিসমূহও বিভিন্ন । পাইথন; রেটিকুলেটেড কীংবা বার্মিজ পাইথন যাই হোক না এরা বাংলাদেশের বন্য প্রাণি । পাইথন আমাদের গর্ব । এরা প্রকৃতিতে হান্টিং এর শিকার হলেও আবদ্ধ অবস্থায় আছে বহাল তবিয়তে । করছে বংশ বিস্তার রীতিমত ।

Tagged

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *