কিভাবে সহজ উপায়ে গরু মোটাতাজা করবেন? – মুক্তি মাহমুদ

খামার ব্যবস্থাপনা গরু পালন গরু মোটাতাজাকরণ প্রাণিসম্পদ

বিফ ফ্যাটেনিং বা গরু মোটাতাজা কি ভাবে করবেন? আসুন,সোজাসাপটা রাস্তা দেখিয়ে দেই!


অনেকেই গরু মোটাতাজা করণ বা বিফ ফ্যাটেনিং করার জন্য সহজ একটা গাইডলাইন খুঁজে থাকেন। আজকের এই পোস্টে আমি সেটাই দিয়ে দিচ্ছি এবং অবশ্যই সেটা আমার দৃষ্টিকোণ থেকে!
বিফ ফ্যাটেনিং বা গরু মোটাতাজা করণ একটা শিল্প। এটা সম্পূর্ণই কৌশল ভিত্তিক। আপনি যদি মোটাতাজা করণের কৌশল গুলি না জানেন তাহলে যতই ভালো জাতের গরু নির্বাচন করেন বা গরুকে খাওয়ান না কেনো আপনি ভালো ফলাফল আশা করতে পারবেন না। আর এইসব কৌশল গুলি আহামরি কিছু নয়। তবে ভালো ফ্যাটেনিং ফার্মার হতে চাইলে আপনাকে অন্তত কিছুটা হলেও গরুর রোগ-বালাই সম্পর্কিত জ্ঞান,গরুর খাদ্য উপাদান গুলির পুষ্টিমান, বিভিন্ন গরুর জাতের বৈশিষ্ট্য , বাজার ব্যবস্থা ইত্যাদি সম্বন্ধে ধারণা থাকতে হবে বা ধারণা নিতে হবে। যাক, এবার মূল আলোচনায় আসি।
আমি গরুর আবাসন ব্যবস্থা নিয়ে তেমন বিশদ আলোচনায় যেতে চাই না, শুধু বলবো গরুর ঘর বা শেড টা যাতে উত্তর-দক্ষিণ মুখী এবং ঘরের মেঝের ঢাল যাতে ঠিক থাকে যাতে ঘরে পানি না দাঁড়ায় এবং শুকনো থাকে। তাছাড়া গরুর ঘরটি যাতে কিছুটা হলেও রোদ পায় এবং ঘরের ভিতরটা যাতে স্যাঁতসেতে না থাকে।
এতোটুকু হলেই চলবে!
এবার আসি কি ধরণের গরু আপনি মোটাতাজা করার জন্য বাছাই করবেন সেই বিষয়ে। এই ক্ষেত্রে আপনি বড় ফ্রেমের দেশাল বা দেশী ষাঁড় এবং বলদ,সিন্ধি-শাহীওয়াল ক্রস,শাহীওয়াল ক্রস,শাহীওয়াল, শাহীওয়াল-ফ্রিজিয়ান ক্রস,দেশী-ফ্রিজিয়ান ক্রস,ফ্রিজিয়ান,জার্সি-শাহীওয়াল ক্রস এসব জাতগুলি বেছে নিতে পারেন মোটাতাজা করার জন্য। গরু বাছাইয়ের সময় কিছু বিষয়ের প্রতি অবশ্যই নজর রাখবেন,
১। গরুর ফ্রেম বা খাঁচা জাতে বড় হয়।
২। গরুর চোখ উজ্জ্বল ও নাক জাতে ভেঁজা থাকে।
৩। গরুর অস্থি-সন্ধি বা পায়ের গিঁড়া এবং লেজের গোঁড়া যাতে মোটা হয়।
৪। গরুর মুখ যাতে বেঁটে থাকে এবং মাথা বড় হয় এবং গরুটি যাতে ২৪-৩০ মাস বয়সের অথবা দুই বা চার দাঁতের হয়।
৫। গরুর পৃষ্ঠদেশ এবং বুক বা শিনা যাতে প্রশস্ত থাকে।
৬। গরুর খুর যাতে অশ্ব-খুর সদৃশ হয় এবং পিছনের পা দুইটি যাতে একটি আরেকটির সাথে লেগে না থাকে দাঁড়ানো অবস্থায়।
৭। সর্বোপরি গরুটি এমন হতে হবে যাতে গরুর পাজরের হাঁড় দৃশ্যমাণ হয়,গায়ে মাংস কম থাকে এবং আপাত দৃষ্টিতে গরুটি নিরোগ মনে হয়।
জাত যেটাই হোক, মোটামুটি উপরের বৈশিষ্ট্য গুলি থাকলেই সেই গরুটা মোটাতাজা করে লাভবান হওয়া যাবেই। তবে জাতের বোশিষ্ট্য থেকে আমরা আরো বেশী ফলাফল লাভ করতে পারি।এই জন্য জাত বিচার করে গরু মোটাতাজা করার জন্য সংগ্রহ করলে আরো বেশী লাভবান হওয়া যায়!
এবার আসি গরু খামারে সংগ্রহ করে আনার পর আপনি কি কি করবেন সেই বিষয়ে।
আপনি যদি গরু কোনো গৃ্হস্থ্যের ঘর থেকে সংগ্রহ করেন তাহলে সেটাকে ভালো ভাবে পটাশের পানি দিয়ে পরিষ্কার করে আপনার গোয়াল ঘরে প্রবেশ করিয়ে দিবেন। কিন্তু যদি হাট থেকে গরু সংগ্রহ করেন তাহলে সেটাকে পটাশের পানি দিয়ে ভালোভাবে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে গোয়াল ঘর বা শেডে প্রবেশ করাবেন। এরপর পানিতে কিছু ইলেক্ট্রোলাইট বা স্যালাইন মিশিয়ে গরুকে খেতে দিবেন। যদি দূর থেকে গরু পরিবহন করে আনেন তাহলে গরুকে তার লাইভওয়েট অনুযায়ী ফাস্টভেট বা প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ খাইয়ে দিবেন যাতে ব্যাথা বা ব্যাথা থেকে সৃষ্ট জ্বরের উপশম হয়। পানি কোন অবস্থাতেই অতিরিক্ত পরিমাণে খেতে দিবেন না প্রথমেই। পানি খাওয়ানোর ১/২ ঘন্টা পরে খড় বা কাঁচা ঘাস অল্প পরিমাণে খেতে দিবেন গরুকে। এর ঠিক ৬-৮ ঘন্টা পর দানাদার খাদ্য খেতে দিবেন।
★গরু গোয়ালঘরে প্রবেশ করানোর ঠিক ৩ দিন পর গরু যদি সুস্থ থাকে তাহলে FMD বা ক্ষুরা রোগের ভ্যাক্সিন দিয়ে দিবেন প্রত্যেকটা গরুকে। এর ঠিক একসপ্তাহ পর কৃমিনাশক ওষুধ দিয়ে দিবেন প্রতিটা গরুকে।নিয়মমাফিক লিভার টনিক দিবেন কৃমিনাশক ওষুধপাতি দেয়ার পর। কৃমিনাশক ওষুধ দেয়ার ঠিক তিন দিন পর গরুকে ক্যাটাফজ বা ভিটাফজ অথবা এমাইনোভিট জাতীয় ভিটামিন সাপ্লিমেন্টারী ইঞ্জেকশন দিবেন গরুর লাইভওয়েট অনুযায়ী নির্দেশিকা অনুসারে। এই ইঞ্জেকশন দেয়ার ঠিক ছয় দিন পরে এন্থ্রাক্সের (Anthrax) টিকা এবং দুয়েকদিন আগেপিছে করে আইভার ম্যাক জাতীয় বহি ও অন্ত পরজীবির জন্য ইঞ্জেকশন দিয়ে দিবেন চামড়ার নীচে ওষুধ কোম্পানির নির্দেশিকা অনুযায়ী পরিমাণে। প্রথমবার ভিটামিন সাপ্লিমেন্টারী ইঞ্জেকশণ দেয়ার ১৫ দিন পর আবার ভিটামিন সাপ্লিমেন্টারী ইঞ্জেকশন রিপিট ডোজ করবেন এবং এর পর প্রতি মাসে সেটা রিপিট ডোজ করবেন। মনে রাখবেন প্রচুর পরিমাণে কাঁচা ঘাস থাকলে ভিটামিন সাপ্লিমেন্টারী ইঞ্জেকশন তেমন একটা প্রয়োজন পরে না। তবে এই চার মাস সময় কালের মধ্যে অন্তত দুইবার এডি৩ই ইঞ্জেকশন টা দিলে গরুর আকৃতি কিছুটা হলেও বাড়ে!
★প্রথম প্রথম গরুকে দানাদার খাদ্য যখন পরিবেশন করবেন তখন সেটার পরিমান আস্তে আস্তে বাড়াবেন। গরু গোয়ালঘরে প্রবেশ করানোর ১ সপ্তাহের মধ্যে গরুকে তার দৈহিক ওজন বা লাইভওয়েট অনুযায়ী খাদ্য প্রদান করবেন যতটুকু পরিমান নির্দিষ্ট করা থাকবে!
আমি সাধারণত ৪ মাসের স্লট বা ভাগে যেসব গরু মোটাতাজা করে থাকি তাদের জন্য তিনটি পর্যায়ে দানাদার খাদ্যের পরিমাণ নির্দিষ্ট করে দেই। আমি নীচে পয়েন্ট আকারে পর্যায় গুলির নাম এবং সেই সময় গরু কতটুকু করে দানাদার খাদ্য পাবে সেগুলি উল্লেখ করে দিচ্ছি।
★স্টার্টার লেভেলঃ আমি প্রথম মাসকে স্টার্টার লেভেল ধরি৷ এই সময়ে গরুকে ১০০ কেজি লাইভওয়েটের জন্য ১ কেজি সুষম দানাদার খাদ্য সরবরাহ করবেন সাথে ৪ কেজি কাঁচা ঘাস এবং ১ কেজি ভিজানো ছোটো ছোটো আকারে কাটা খড় যেটা সামান্য চিটাগুড় দিয়ে মেশানো থাকবে।
★গ্রোয়ার লেভেলঃ গ্রোয়ার লেভেলের ব্যাপ্তিকাল হলো দুই মাস। এই সময়ে গরুকে ১০০ কেজি লাইভওয়েটের জন্য ১.২৫ কেজি সুষম দানাদার খাদ্য সরবরাহ করবেন সাথে ৪ কেজি কাঁচা ঘাস এবং ১ কেজি ভিজানো ছোটো ছোটো আকারে কাটা খড় যেটা সামান্য চিটাগুড় দিয়ে মেশানো থাকবে।
★ফিনিশার লেভেলঃ ফিনিশার লেভেলের সময়কাল হলো একমাস। এই মাসেই গরুকে বাজারে বিক্রয় উপযোগী করে ফেলতে হবে। এই সময়ে গরুকে ১০০ কেজি লাইভওয়েটের জন্য ১.৫ কেজি সুষম দানাদার খাদ্য সরবরাহ করবেন সাথে ৪ কেজি কাঁচা ঘাস এবং ১ কেজি ভিজানো ছোটো ছোটো আকারে কাটা খড় যেটা সামান্য চিটাগুড় দিয়ে মেশানো থাকবে। এই সময়ে গরুর দানাদার খাদ্যে কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ একটু বাড়িয়ে দিতে পারেন যদি কোরবানি মৌসুম সামনে থাকে। কারণ, গরুর বাহিরের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য এই সময়ে গরুর শরীরে একটু চর্বি যোগ করতে হয় এবং অনেকেই সেটা চায়! আবার গরুর স্বাস্থ্য যদি পেটানো বা মাংসল চান, তাহলে আবার এই কাজটা করা যাবে না!
★এইবার আসি গরুর দানাদার খাদ্যের তালিকা কেমন হবে সেটা নিয়ে। আমি দুইটা তালিকা দিচ্ছি নীচে। একটা আমি বর্তমানে ফলো করছি, আরেকটা আগে ফলো করতাম। তবে বর্তমানে যেটা আমি ফলো করছি সেটা সাশ্রয়ী এবং এর ফলাফল ভালো। অনেকে গরুর খাদ্য তৈরীতে ঝামেলা করতে চান না, তাদের জন্য দ্বিতীয় তালিকাটি। এখন সিদ্ধান্ত আপনাদের উপর কে কোনটা অনুসরণ করবেন!
*১ নং খাদ্য তালিকাঃ


ঈস্ট ফারমেন্টেড ভুট্টার গুড়া ৫০%
কুরা ১৫%
ফারমেন্টেড এংকর বা মটর ডালের গুঁড়া ২০%
মশুরির ভুষি ৮%
সরিষার খৈল ৫%

লাইমস্টোন পাউডার ২%

মোট ১০০%

*২ নং খাদ্য তালিকাঃ


ভুট্টার গুড়া সিদ্ধ করা ৪০%
এংকর ডালের গুড়া সিদ্ধ করা ২০%
মশুরের ভুষি ১০%
গমের ভুষি ১০%
সরিষার খৈল ৫%
মিহি কুরা ১৩%

লাইমস্টোন পাউডার ২%

মোট ১০০%
এছাড়াও প্রতিটি গরুকে মাথাপিছু ১০০-১৫০ গ্রাম চিটাগুড় এবং ২৫/৩০ গ্রাম লবণ দানাদার খাদ্যের সাথে মিশিয়ে দিবেন।
যদি আপনাদের কাছে কাঁচা ঘাস না থাকে সেই ক্ষেত্রে ১০০ কেজি লাইভওয়েটের গরুর জন্য দৈনিক ১.৫ কেজি খড় প্রসেস করে দিবেন। কিভাবে প্রসেস করবেন সেটা সংক্ষেপে বলে দিচ্ছি আমি। ১০ কেজি খড়ে ২ কেজি ফারমেন্টেশন করা ভুট্টা ৩-৪ লিটার পানি এবং ৫০০ গ্রাম চিটাগুড় মিশিয়ে মোটা পলিব্যাগের মধ্যে এয়ারটাইট করে ৪৮ ঘন্টা রেখে দিন। এর পর সেটা বের করে গরুকে খেতে দিন। খুব ভালো ফল পাবেন এতে।
মাঝেমধ্যে গরুকে জিংক সাপ্লিমেন্টারী দিতে পারেন যাতে গরুর গায়ের রং সুন্দর হয় এবং তার খাদ্য চাহিদা যাতে বাড়ে।
কাহিনী আর লম্বা করতে চাচ্ছি না। মোটামুটি এইভাবে আপনি অনায়াসে গরুকে স্বল্প সময়ে মোটাতাজা করে বাজারে বিক্রয় উপযোগী করে তুলতে পারেন। আরেকটা কথা গরু পালনের সময় যদি গরুর দৈহিক ওজন নিয়মিত সপ্তাহান্তে রেকর্ড করতে পারেন তাহলে লাভ-লসের ধারণাটা মাথায় থাকবে আপনার। কাজেই সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতেও আপনার সুবিধা হবে।
আজ আলোচনা এতোটুকুই। পোস্ট পড়ার সময় বোঝার চেষ্টা করবেন,একান্তই না বুঝলে কমেন্ট করবেন। কোনো ধরণের বিতর্কে যাবেন না,পোস্ট পছন্দ না হলে এড়িয়ে যাবেন। এটা আমার দৃষ্টিকোণ থেকে দেয়া পোস্ট,দ্বিমত থাকতেই পারে! কিন্তু আমি কোনো ধরনের তর্ক বা বিতর্কে যাবো না!

লেখকঃ মুক্তি মাহমুদ ভাই

Tagged

1 thought on “কিভাবে সহজ উপায়ে গরু মোটাতাজা করবেন? – মুক্তি মাহমুদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *