গরুর খাদ্য হিসেবে সজিনা পাতার ব্যতিক্রমী ব্যবহার

গরুর খাদ্য হিসেবে সজিনা পাতার ব্যতিক্রমী ব্যবহার

খামার ব্যবস্থাপনা গরু মোটাতাজাকরণ গরুর ফিড ফর্মুলেশন ডেইরি ফার্মিং প্রাণিসম্পদ ফিড ফর্মুলেশন

প্রিয় পাঠক, আজ আমি জানাব গরুর খাদ্য হিসেবে সজিনা পাতার ব্যতিক্রমী ব্যবহার নিয়ে। সজিনা গাছকে বলা হয়ে থাকে “অলৌকিক গাছ” “জাদুকরী গাছ” আর সজিনাকে বলা হয় সুপার ফুড। হাজারো পুষ্টি গুণে ভরপুর এই সজনে গাছের ব্যবহার শুধু আমাদের মানব জাতীর জন্যই সীমাবদ্ধ নয়। গবাদি পশু-পাখির খাদ্য হিসেবে ও বেশ উপকারী এই সজনে গাছের বিভিন্ন অংশ। জেনে অবাক হবেন যে, আমরা ইদানীয় যে উন্নত উন্নত জাতের হাইব্রীড ঘাস উৎপাদন করে থাকি গরু ছাগলের জন্য, তার চাইতেও ঢেড় বেশি পুষ্টি রয়েছে এই সজিনা পাতায়। আর ঠিক এ কারনেই উন্নত বিশ্বে এখন প্রাণির অন্যতম খাদ্য উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে সজনে পাতা। সজিনা গাছ আমাদের দেশের অবহাওয়ায় বেশ ভাল জন্মে। তাই দেশের গবাদি প্রাণির পুষ্টি চাহিদা মেটাতে কাজে লাগানো যেতে পারে সজিনা চাষকে।

সজিনা পাতা গরু, ছাগল, হাঁস , মুরগি, এবং মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার উপযোগি। তবে এক এক প্রজাতির প্রাণিতে ব্যবহারের পরিমাণ এবং ব্যবহারের পদ্ধতি ভিন্ন ভিন্ন। তাই আজ আমি এই পর্বে আলোচনা করব – কিভাবে গরুর খাদ্য হিসেবে সজিনা পাতা ব্যবহার করা যায় এবং এর ফলে কি কি উপকার হয়? এর পরে পর্যায়ক্রমে গরু, মুরগি এবং মাছের খাদ্য হিসেবে কিভাবে সজনে পাতা ব্যবহার করা যায় সেটা আলোচনা করব।

সজিনার পুষ্টিমানঃ

  • ড্রাই ম্যাটারঃ ২৫%
  • প্রোটিনঃ ২৫ – ৩০ %
  • ফ্যাটঃ ৫ -৬ %
  • ফাইবারঃ ১৩ – ১৪%
  • অ্যাশঃ ১০ -১২ %
  • এনার্জিঃ ১৪৫০ কিলোক্যালরি প্রতি কেজিতে।

এছাড়াও সজিনাতে রয়েছে প্রচুর পরিমানে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, আয়রন, জিংক, ভিটামিন ও অন্যান্য এসেনশিয়াল এমাইনো এসিডস। যা প্রচলিত যে কোনো ঘাসের পুষ্টিমানের চেয়ে অনেক বেশি; যা গরু, ছাগল, হাঁস মুরগি এবং মাছের পুষ্টি চাহিদা মিটাতে পারে অনায়াসেই।

গরুর খাদ্য হিসেবে সজিনা পাতার ব্যতিক্রমী ব্যবহার
গরুর খাদ্য হিসেবে সজিনা পাতার ব্যতিক্রমী ব্যবহার

গরুর খাদ্য হিসেবে সজিনা পাতার ব্যবহারঃ

  • গরুকে সজনে পাতা খেতে দিলে গরুর শারীরিক ওজন দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
  • গরুর খাদ্য হজম প্রক্রিয়া উন্নত হয়।
  • সজিনা পাতা খেলে গরুর পুষ্টি শোষণ ক্ষমতা বাড়ে।
  • সজিনা পাতা উচ্চ প্রোটিন সমৃদ্ধ হওয়ায় তা গরুর প্রোটিনের চাহিদা পূরণে সক্ষম।
  • যেকোনো হাইব্রিড ঘাসের চেয়ে সজিনার পুষ্টিমান বেশী।
  • গরুর খাদ্য তালিকায় সজিনা পাতা রাখলে করলে গরুর পারফর্মেন্স ভাল হয়।
  • সজনে গাছের উৎপাদন নেপিয়ার ঘাসের চেয়ে ও বেশি। যেখানে নেপিয়ারের উৎপাদন প্রতি হেক্টরে ৩০০ মেঃটন; সেখানে সজিনার উৎপাদন প্রতি হেক্টরে ৬৫০ মেঃটন।

গরুকে সজিনা পাতা খাওয়ানোর নিয়মঃ

সজনে পাতা গরুকে কাঁচা ঘাস হিসেবে সরাসরি খেতে দেয়া যায়। তবে, আপদকালীন সময়ের জন্য যেমন, বন্যা,খড়া অথবা অন্যান্য সময় যখন খাদ্য সংকট দেখা যায়,তখন এই সজনে পাতা আগে থেকে শুকিয়ে রাখলে তা দানাদার খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা যায়। এক্ষেত্রে, সজনে পাতা রোদে শুকিয়ে নিয়ে গুড়ো করে অন্যান্য দানাদার খাদ্যের মত খাওয়ানো যায়।

গরুকে কি পরিমাণে সজিনা পাতা খাওয়ানো যাবেঃ

গবেষণা লব্ধ ফল হতে জানা যায় যে, সজিনা পাতা উচ্চ প্রোটিন সমৃদ্ধ খাদ্য উপাদান হলেও গবাদিপশুর জন্য সজিনা পাতায় রয়েছে কিছু এন্টি-নিউট্রিয়েন্টস; তাই একক খাদ্য হিসেবে সম্পুর্ন ভাবে সজিনা পাতা ব্যবহার করা উচিত নয়। তাই,

  • বাচ্চা ও বাড়ন্ত গরুকে বিশেষ করে গরু মোটাতাজাকরণে গরুকে তার সব টুকু খাদ্য হিসেবে সজিনা না দিয়ে গরুর তার শরীরের ওজনের  ১ – ১.৫ % সজিনা পাতা খাওয়ানো যেতে পারে। যেমনঃ একটা ১০০ কেজি ওজনের গরুকে দৈনিক ১ – ১.৫ কেজি সজিনা পাতা দেয়া যেতে পারে।

অথবা গরুকে তার রেশনের ৪০ – ৬০ ভাগ সজিনা পাতা দেয়া যেতে পারে। এতে করে গরুর ওজন দৈনিক ৪০০ – ৬০০ গ্রাম করে ওজন বাড়তে পারে।

  • গাভী এবং গর্ভবতী গাভীকে তার শরীরের ওজনের  ০.৫ % সজিনা পাতা খাওয়ানো যেতে পারে। যেমনঃ একটা ২০০ কেজি ওজনের গাভী এবং গর্ভবতী গাভীকে দৈনিক ১ কেজি সজিনা পাতা দেয়া যেতে পারে।

অথবা গাভী এবং গর্ভবতী গাভীকে তার রেশনের ২৫ ভাগ সজিনা পাতা দেয়া যেতে পারে। এতে করে বাড়ন্ত অবস্থায় গাভীর ওজন দৈনিক গড়ে ২৫০ গ্রাম করে ওজন বাড়তে পারে।  

গাভী এবং গর্ভবতী গাভীকে সজিনা পাতা খাওয়ানো যাবে। এতে সমস্যা নাই। তবে, পরিমানে একটু কম দিতে হবে। গাভীর ওজনের সর্বোচ্চা ০.৫% সজিনা পাতা দেয়া যেতে পারে। কেননা, এর চেয়ে বেশি দিলে গাভীর স্থূলতা বৃদ্ধি পেয়ে প্রজনন ক্ষমতা কমে যেতে পারে।

গরুকে সজিনা পাতা খাওয়ানোর অপকারিতাঃ

চলমান গবেষণায়, গরুকে সজিনা পাতা খাওয়ানোর ফলে কোনো ধরনের অপকারিতা বা ক্ষতিকর দিক প্রতীয়মান হয়নি। তবে, সজিনা পাতায় অপ্রত্যাশিত এন্টিনিউট্রিয়েন্ট থাকায়, গরুর শারীরিক ওজনের সর্বোচ্চা ১ – ১.৫ % এর বেশি সজিনা পাতা খেতে দেয়া উচিত নয়।

লেখকঃ ডাঃ শ্রাবণ হাসান সজল

প্রকাশক ও সম্পাদক, সোনালি কৃষি ডটকম ( www.sonalikrishi.com )

এডমিন ও পরামর্শক, ( www.youtube.com/DrSrabonHasansajal )

সিইও, ভেট শপ বাংলাদেশ ( www.facebook.com/vetshopbd )

গরু পালন সম্পর্কিত আরো পরামর্শ পেতে আমার ইউটিউব চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুনঃ

<<<সাবস্ক্রাইব করতে এখানে ক্লিক করুন>>>

Tagged

2 thoughts on “গরুর খাদ্য হিসেবে সজিনা পাতার ব্যতিক্রমী ব্যবহার

  1. নীলফামারিতে আমার মৎস্য ও ডেইরী খামার আছে, সে সাথে সজনা গাছ লাগানোর মত জমিও আছ। এমতাবস্থায় আমি কি আপনার কাছে সহায়তা কামনা করছ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *