গরুর জাত পরিচিতি কংকরেজ বা কংক্রেজ

গরুর জাত পরিচিতি : কংকরেজ /কংক্রেজ

গরু পালন গরুর জাত পরিচিতি

গরুর জাত পরিচিতি:

পূর্ব ইন্ডিয়ার কুচ এবং বানাসকন্ঠা জেলার ৭০০ বর্গমাইল মরুভুমি অঞ্চল থেকে পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে পড়া ‘কংকরেজ’ আমাদের আজকের আলোচিত গরু। জেবু (বস ইন্ডিকাস) জাতের যে কয়টা জাত পৃথিবী জয় করেছে এবং খামারিদের মন কেড়েছে তাদের অন্যতম কংকরেজ। কংকরেজ ছাড়াও বান্নাই, নাগার, তালাবদা, বাঘিয়ার, বাগাড়, ওয়াজেদ সহ আরো অনেকগুলো নামে পরিচিত কংকরেজ ব্রাজিল এর একটা জনপ্রিয় জাত যেটা সেখানে গুজারাত নামে পরিচিত। পর্যায়ক্রমে আমরা বিশ্বের বিভিন্ন জাতের গরুর গরুর জাত পরিচিতি নিয়ে লিখব।

গড় ওজন:

ষাঁড় : ৬০০-৭০০ কেজি।
গাভী : ৪০০-৫৫০ কেজি
বাছুর : ২২-২৫ কেজি। (ইন্ডিয়ান এগ্রিকালচারাল রিসার্চ কাউন্সিল)

উৎস দেশ:

কংকরেজ গরুর অন্যতম আদি নিবাস ইন্ডিয়ার গুজরাট প্রদেশ এর বানাসকন্ঠা জেলার অন্তর্গত ‘কংকরেজ’ তালুক। তাই উৎস স্থানের সাথে মিলায়ে এর জাতের নাম করুন হয়েছে কংকরেজ। সেখানে এটার লোকাল নাম ‘ওয়াদিয়ার’। পার্শবর্তী আরেকটা আদি নিবাস কুচ জেলায় এটার লোকাল নাম ওয়াগাদিয়া। তবে ইন্ডিয়ান গুজরাট প্রদেশ এই গরুর আদি নিবাস হলেও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মাংসের জাত হিসাবে এবং কোথাও জাত উন্নয়নের জন্য কংকরেজ জাতের গরু ব্যবহার করা হয়। ব্রাজিলে গুজারাত নাম পরিচিত জনপ্রিয় গরুর জাতটি ইন্ডিয়ান কংকরেজ থেকে উন্নতন করা হয়েছে।

ইতিহাস:

কংকরেজ গরু কবে থেকে এবং কোথায় প্রথম পালন শুরু হয় তার সঠিক ইতিহাস পাওয়া না গেলেও পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশে মহেঞ্জেদারো খননকালে প্রাপ্ত ৩ হাজার বছর পূর্বের পুরাতত্ত্ব গবেষণা করে দেখা যায় সেখানে সেই সময় যে গরু পালন করা হতো সেটা কংকরেজ গরুর মতো ছিল। তাই ইতিহাসবিদদের অনেকের ধারণা এই জাতের গরুর উৎস স্থান পাকিস্তান ও হতে পারে। পশ্চিম ইন্ডিয়ার বানাস এবং সরস্বতী নদীর শুষ্ক অববাহিকা জুড়ে বিচরণ করা কংকরেজ ইন্ডিয়াজুড়ে এবং পরবর্তীতে পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে পরে এটার উচ্চমানসম্পন্ন দুধ এবং মাংসের জন্য।

খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ : পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশে কংকরেজ গরু পালন করা হতো বলে ইতিহাসবিদদের ধারণা।
১৮৭০ সাল : ব্রাজিল ইন্ডিয়া থেকে কয়েকটি কংকরেজ গরু আমদানি করে।
১৯১৪ সাল : ব্রাজিল ইন্ডিয়া থেকে বড় কংকরেজ ষাঁড় এবং গাভী আমদানি করে।
১৯২১ সাল : ইংল্যান্ডের ফর্মোসা দ্বীপে কংকরেজ গরু আমদানি করা হয়।
১৯২৪ সাল : আমেরিকাতে ভিন্ন নাম কংকরেজ গরু পালন জনপ্রিয়তা লাভ করে।
১৯২৬ সাল : মরিশাস এর আখ চাষীদের মাধ্যমে আফ্রিকাতে কংকরেজ গরু আমদানি করা হয়।(জাতিসংঘ খাদ্য ও কৃষি সংস্থা)

গরুর জাত পরিচিতি কংকরেজ বা কংক্রেজ
গরুর জাত পরিচিতি কংকরেজ বা কংক্রেজ

পালনকারী দেশ ও সংখ্যা:

যদিও কংকরেজ ইন্ডিয়ার ইন্ডিজেনাস গরু কিন্তু পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এই গরু পালন করা হয়। কোথাও মাংসের জাত উন্নয়নে, আবার কোথাও দুধের জাত উন্নয়নে, আবার কোথাও বিশুদ্ধ জাত হিসাবে। মূল পালনকারী দেশ ইন্ডিয়া সহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা মোট কংকরেজ গরুর সংখ্যা জানা না গেলেও জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা কর্তৃক এক পুরানো গবেষণা রিপোর্টে দেখা যায় গুজরাটে ১৩০০,০০০ বিশুদ্ধ জাতের গরুর মধ্যে ৫০০,০০০ কংকরেজ পালন করা হয়। উনিশ শতকে ব্রাজিলে গির, কংকরেজ আর অঙ্গল থেকে উন্নয়ন করা ‘ইন্দুব্রাজিল’ মাংসের জন্য একটা বিখ্যাত জাত। এছাড়া ব্রাজিলে ‘গুজেরাত’ নাম দিয়ে বিশুদ্ধ কংকরেজ জাতের গরু পালন করা হয়। ব্রাজিল ছাড়াও অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা ও আফ্রিকা মহাদেশের নামিবিয়া, জাম্বিয়া, কেনিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা সহ পৃথিবীর অধিকাংশ গরু পালনকারী দেশে কংকরেজ অথবা কংকরেজ থেকে উন্নয়ন করা গরু পালন করা হয়। এমনকি আমেরিকাতে উন্নয়ন করা যে ব্রহ্মা বা ব্রাহমা মাংসের গরু হিসাবে পৃথিবীজুড়ে জনপ্রিয় হয়েছে, সেটাও উন্নয়ন করা হয়েছে উনিশ শতকে ব্রাজিলে গির, কংকরেজ আর অঙ্গল থেকে উন্নয়ন করা ‘ইন্দুব্রাজিল’ থেকে।

বৈশিষ্ট ও সুবিধা:

লম্বা, বাঁকানো ও ছড়ানো সিং দেখে সহজে সনাক্তযোগ্য পশ্চিম ইন্ডিয়ার শুষ্ক মরুভুমি অঞ্চলের গরু কংকরেজ শক্ত, রোগ প্রতিরোধী এবং অতি উষ্ণ আবহাওয়াতে সহজে মানিয়ে নিতে পারে। রুপালি ধূসর অথবা ইস্পাত কালো রঙের কংকরেজ গরুতে মূলত ধূসর, সাদা এবং কালো রঙের আধিক্য দেখা যায়। যদিও ৬ থেকে ৯ মাস বয়স পর্যন্ত এই গরুর বাছুর এর রং মরিচ ধরা লোহার লাল রং এবং সাদা কালো হয়ে থাকে এবং বয়স বাড়ার সাথে সাথে রং অনেকটা পরিবর্তন হতে থাকে। চওড়া কপালের কংকরেজ গরুর চুট, কপাল এবং পিঠের উপরে কালো অথবা কালচে ধূসর রং এর আধিক্য দেখা যায়। তবে লেজ এর শেষ অংশ কালো হওয়া এই গরুর সাধারণ বৈশিষ্ট্য। ঢিলা এবং মধ্যম পুরু চামড়ার উপর ছোট এবং নরম লোমধারী কংকরেজ গরু সহজে পরজীবী দ্বারা আক্রান্ত হয়না এবং অতি গরমেও অবসাদগ্রস্থ হয়ে পড়েনা। লম্বা ও ঝুলন্ত কান এবং কালো নাক এবং কালো শক্ত ক্ষুর এই গরুর অন্যতম বৈশিষ্ট।

দুধ ও মাংস উৎপাদন:

ইন্ডিয়াতে কংকরেজ জাতের গড় দুধ উৎপাদন ১৭০০-১৮০০ কেজি হলেও ৪৯০০ কেজি পর্যন্ত দুধ উৎপাদনের রেকর্ড ইন্ডিয়াতে রয়েছে। জাতিসংঘ খাদ্য ও কৃষি সংস্থা কর্তৃক গুজরাটে ৩৪৮ টা গাভীর উপর গবেষণা করে প্রতি দুধ উৎপাদনকালে গড়ে ১৭৪২ কেজি দুধ উৎপাদনের রেকর্ড পাওয়া যায়। এই জাতের গাভী ৪ থেকে ৫ মাস পর্যন্ত দুধ উৎপাদন অপরিবর্তিত থাকে। এরপরে দুধ উৎপাদন কমে যায় যেটা বস ইন্ডিকাস (জেবু) জাতের গভীর সাধারণ বৈশিষ্ট্য। তবে কমে গেলেও ৩০০-৩১০ দিন পর্যন্ত সন্তোষজনক পরিমান দুধ উৎপাদন হয়ে থাকে। জাতিসংঘ খাদ্য ও কৃষি সংস্থার করা এক গবেষণায় দেখা যায় গুজরাটে এই গাভীর গড় দুধ উৎপাদনকাল ৩০৭ দিন এবং সর্বোচ্চ দুধ উৎপাদনকাল ৩৭১ দিন । তবে গাভীতে সিমেন দেয়ার পর দুধ কমে যাওয়া দুধ উৎপাদনের গরু হিসাবে এই জাতের প্রধান সমস্যা। তবে উচ্চমাত্রার ফ্যাট এবং A2 মিল্ক প্রোটিন সমৃদ্ধ কংকরেজ গাভীর দুধ খুবই সুস্বাদু। এই জাতের গরুর দুধে গড়ে ৪.৫৬ মাত্রার ফ্যাট এবং প্রায় সময় পরিমান মিল্ক প্রোটিন পাওয়া যায় (জাতিসংঘ খাদ্য ও কৃষি সংস্থা )। আর এই জাতের ষাঁড় বড় আকৃতির এবং মাংস সুস্বাদু হয়ে থাকে। মাংসের জাত হিসাবে কংকরেজ জাতের গরুর আরেকটা উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো দ্রুত শারীরিক বৃদ্ধি। তাই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দুধের জাতের চেয়ে মাংসের জাত হিসাবে এবং মাংসের জাত উন্নয়নে এই জাতের গরু বেশি ব্যবহার করা হয়।

অর্থনৈতিক গুরুত্ব:

যেহেতু কংকরেজ জাতের গরু ভালো মানের এবং উচ্চ প্রোটিন ও ফ্যাট যুক্ত A2 দুধ উৎপাদন করে তাই এই জাতের দুধের রয়েছে উচ্চমূল্য এবং অধিক চাহিদা। এছাড়া এই জাতের গরুর মাংস যেহেতু খুব সুস্বাদু এবং ষাঁড় এর সাইজও যেহেতু বড় হয়ে থাকে, তাই মাংসের জন্য কংকরেজ গরু পালন লাভ জনক হিসাবে প্রমাণিত। তবে এই জাতের সবচে বেশি গুরুত্ব যে কারণে সেটা হলো জাত উন্নয়ন। আমাদের দেশে যতগুলো বড় খামার আছে, যারা জাত উন্নয়ন করে, তাদের প্রায় প্রত্যেকের কাছে এই জাতের গরু আছে। কারণ কংকরেজ এর সাথে উন্নয়ন করা গরু শক্ত, রোগ প্রতিরোধী, অধিক ও উন্নত মানের দুধ, দেখতে সুন্দর এবং ষাঁড় এর আকৃতিও বড় হয়ে থাকে। কংকরেজ একটি উচ্চ প্রজননক্ষম গরু। এই জাতের গভীর ২ টি বাচ্চা প্রসবের মধ্যবর্তী গড় বিরতিকাল ৪৯৯ দিন। একটি কংকরেজ গাভী জীবনকালে গড়ে ১১ টি বাচ্চা দেয়।

‘কংকরেজ’ গরু পালনে সমস্যা:

যেহেতু, কংকরেজ উপমহাদেশের বস ইন্ডিকাস জাতের গরু তাই দুধ উৎপাদন ইউরোপের বস টোরাস জাতের ক্রস এর চেয়ে কম লাভজনক। এছাড়া এই জাতের গরু ইউরোপের ক্রস জাতের গরুর চেয়ে প্রথম বাচ্চা দিতে ৪ মাস সময় বেশি লাগে। ক্রস জাতের গরু যেখানে ২৮ মাসের মধ্যে প্রথম বাচ্চা দেয় সেখানে এই জাতের সময় লাগে ৩০-৩৪ মাস। এই জাতের গভীর ২ টি বাচ্চা প্রসবের মধ্যবর্তী গড় বিরতিকাল ৪৯৯ দিন, যা ইউরোপের বস টোরাস জাতের চেয়ে বেশি।

জীবনকাল:

একটি কংকরেজ গরুর গড় জীবনকাল সাধারণত ২০ বছর। এই জাতের গরু যেহেতু বস ইন্ডিকাস জাতের মধ্যে একটি উচ্চ প্রজননক্ষম জাত, একটি কংকরেজ গাভী জীবনকালে গড়ে ১১ টি বাচ্চা দেয়।

আগামি পর্বে আলোচনা করব অন্য কোনো গরুর জাত পরিচিতি নিয়ে।

ক্রেডিটঃ জাহিদুল ইসলাম (এডমিন, পিডিএফ)

ফেসবুকে আমরাঃ >>>ফলো করুন<<<

ইউটিউবে আমরাঃ >>>সাবস্ক্রাইব করুন<<<

Tagged

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *