বানিজ্যিকভাবে কোয়েল পাখি পালন – পর্ব ০২

কোয়েল পালন খামার ব্যবস্থাপনা

( বিষয়ঃ কোয়েলের বাসস্থান, লিটার পদ্ধতিতে কোয়েল পালন, খাঁচা পদ্ধতিতে কোয়েল পালন ) <<<১ম পর্ব টি পড়তে এখানে ক্লিক করুন>>>

কোয়েলের বাসস্থান

কোয়েল পালনের জন্য যেহেতু অল্প জায়গার প্রয়োজন সেহেতু আপনি আপনার বসতবাড়ির আশেপাশে আর শহরে হলে বাসায় ছাদে কোয়েল খামার করতে পারেন। খামার যেখানেই করুন না কেন,জায়গাটা হতে হবে আলো বাতাস যুক্ত ও বন্যপ্রাণীদের নাগাল মুক্ত। শহরে ছাদে বা রুমে অনেকে শখের বসে বানিজ্যিক কোয়েল খামার করতে আগ্রহ প্রকাশ করে থাকেন। কিন্তু কোয়েল খামারের উৎপাদিত গন্ধ ও মল নিষ্কাশনের বিষয় টি মাথায় নিয়ে আগাতে হবে। এছাড়া সিটি কর্পোরেশন এলাকায় বানিজ্যিক খামার তৈরি না করাই ভাল, এতে আপনি নানাভাবে হ্যারেজমেন্টের শিকার হতে পারেন।

কোয়েল সাধারনত ২ ভাবে পালন করা যায়-

1. লিটার বা ফ্লোর পদ্ধতি

2. খাঁচা পদ্ধতি

লিটার পদ্ধতিতে কোয়েল পালন

এই পদ্ধতিতে সাধারনত কাঁচা মাটির উপরে বা পাকা ফ্লোরে লিটার অর্থাৎ শুকনো কাঠের গুড়ি (স”মিল এ পাওয়া যায়),ধানের তুষ বা চিটা অথবা বালি ৩-৫ ইঞ্চি পুরু করে বিছিয়ে দিয়ে তার উপরে কোয়েল পালন করা হয়।

লিটার ব্যবস্থাপনাঃ

লিটারঃ পোল্ট্রির ঘরে শয্যা হিসেবে ব্যবহৃত বিভিন্ন বস্তুকে লিটার বলে৷ এক কথায় বাসস্থানকে আরামদায়ক করার জন্য কোয়েলের ঘরে যে বিছানা ব্যবহার করা হয় তাই লিটার।

লিটারের উপকরণঃ লিটার হিসেবে সাধারণত ধানের তুষ, করাতের গুঁড়া, ধান বা গমের শুকনো খড়ের টুকরো, কাঠের ছিলকা, বাদামের খোসার গুঁড়া ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়৷ এগুলো এককভাবে ব্যবহার না করে সাধারণত কয়েকটি একসঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করা ভাল।

লিটার প্রস্তুতঃ

  • শুরুতে ৩ সে.মি. পুরু লিটার সামগ্রী পরিস্কার মেঝেতে ছড়িয়ে দিতে হবে৷
  • ধীরে ধীরে আরো লিটার সামগ্রী যোগ করে ৪-৫ সপ্তাহের মধ্যে এই পুরুত্ব ৫ সে.মি.-এ উন্নীত করতে হবে৷
  • ব্যাটারি ব্রুডারে পালিত বাচ্চার ক্ষেত্রে শুরুতেই ৫ সে.মি. পুরু লিটার ব্যবহার করতে হবে৷
  • স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করতে তাজা লিটার সামগ্রী বিছানোর পরপরই কোনো উৎকৃষ্টমানের ও কার্যকরী জীবাণুনাশক স্প্রে করতে হবে৷ তবে, বাচ্চা নামানোর ৭২ ঘন্টা পূর্বেই এ কাজ শেষ করতে হবে৷

লিটারের পরিচর্যাঃ

  • উৎকৃষ্ট লিটারের আর্দ্রতা সবসময় ২০-২৫% হওয়া উচিত৷
  • অতিরিক্ত আর্দ্রতা দূর করার ব্যবস্থা করতে হবে৷
  • লিটারের স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ রক্ষার জন্য ঘনঘন লিটার উল্টেপাল্টে দিতে হবে৷
  • ঘরে বায়ু চলাচলের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখতে হবে৷
  • বাতাসে আর্দ্রতা বেড়ে গেলে ৪-৫ কেজি/১০ ঘনমিটার জায়গা (ফ্লোর এরিয়া) হিসেবে লিটারে কলিচুন (স্ল্যাকড লাইম) যোগ করতে হবে৷
  • পানির পাত্রের চারদিকের ভেজা লিটার বদলে তাজা লিটার সামগ্রী দিতে হবে৷
  • অতিরিক্ত গরমে লিটারের আর্দ্রতা কমে গেলে স্প্রে’র মাধ্যমে পানি ছিটিয়ে আর্দ্রতা ঠিক রাখতে হবে৷

লিটার পদ্ধতিতে পালনের সুবিধা

প্রথমেই বলে নিই লিটার বা মেঝে পদ্ধতিতে কোয়েল পালনের সুবিধার চেয়ে অসুবিধাই বেশি।তবুও কিছু সুবিধা তো আছেই।যেমন-

  • লিটারের দ্রব্যাদি সহজলভ্য আর সস্তা
  • এই পদ্ধতিতে শুধুমাত্র ঘর তৈরি করেই মেঝেতে পাখি পালন করা যায়।তাই খরচ কম হয়।কিন্তু খাচা পদ্ধতিতে ঘর এবং খাচা দুটোই তৈরি করা লাগে তাই খরচ বেশি হয়।
  • কোনো পাখি রোগাক্রান্ত হলে বা কোনো সমস্যা দেখা দিলে সহজেই খামারের একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পাখি গুলা সহজেই পর্যবেক্ষণ করা যায়।

লিটার পদ্ধতিতে পালনের অসুবিধা

লিটার পদ্ধতিতে কোয়েল পালনের অসুবিধার কথা বলে শেষ করা যাবে না।তবুও কিছু না বলে আর থাকতে পারছি না।

  • এই পদ্ধতিতে ব্যবহৃত লিটার দ্রব্যাদি জমাট বেঁধে খামারে এমোনিয়া গ্যাস সৃষ্টি হয়।যা পাখির জন্য খুবই ক্ষতিকর।এতে পাখি মারা যেতে পারে এবং ডিমের উৎপাদন কমে যেতে পারে।
  • লিটার জমাট বেঁধে যায় বলে মাঝে মাঝেই লিটার উলট পালট করে দিতে হয়।যা কষ্টসাধ্য।
  • এই পদ্ধতিতে পাখি লিটার বা মেঝের উপরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ডিম পাড়ে ফলে ডিম সংগ্রহ করার কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে।
  • ডিম পেড়ে পাখির যদি দৌড়াদৌড়ি করে বা একটা আরেকটাকে তাড়া করে তবে লিটারে পড়ে থাকা ডিম ভেঙ্গে যায়।যা খামারের জন্য আর্থিক ক্ষতির কারন।
  • এছাড়া ঘরের মধ্যে ইঁদুর বা ছুঁচো ঢুকে ডিম বা পাখি খেয়ে ফেলতে পারে।
  • এই পদ্ধতিতে রোগ-জীবানু হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।কারন পাখি লিটারের উপরেই পায়খানা করে এবং সেই পায়খানা থেকে রোগ-জীবানু সৃষ্টি হতে পারে।
  • লিটার নষ্ট হয়ে গেলে মাঝে মাঝে তা পরিবর্তন করে দিতে হয়।যা কষ্টসাধ্য এবং একই সাথে ব্যয়বহুল।
  • খাবার ও পানির পাত্র মেঝেতে একটা একটা করে সাজিয়ে দিতে হয়।তাই প্রতিদিন অনেক গুলা পাত্র বের করে পরিষ্কার করে আবার পানি ও খাবার ভরে সাজিয়ে দিতে হয়।এটা সময় সাপেক্ষ ও বেশি শ্রম লাগে।
  • লিটারের উপরে পড়ে থাকা পায়খানা বা মল পাখির পায়ের সাথে জড়িয়ে গিয়ে তার সাথে লিটার মানে গাছের গুড়ি বা তুষ মিশে পাখির পায়ে শক্ত গুটির মত সৃষ্ট হয়।ফলে পাখি হাটতে পারে না।যার কারনে খাবার ও পানি খেতে পারে না।পাখি শুকিয়ে যায় অবশেষে মারা যেতে পারে।
  • পাখির পালক পড়ে যায় সহজেই।
  • এছাড়া লিটারে পালন করলে কোয়েলের কৃমি রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

খাঁচায় কোয়েল পালন

এই পদ্ধতিতে লোহা,জি আই তার দিয়ে কোয়েলের জন্য বিশেষভাবে খাঁচা তৈরি করা হয়ে থাকে।তবে কেউ চাইলে বাঁশ-কাঠ দিয়েও খাঁচা বানাতে পারে।তবে লোহার খাঁচা টেকসই ও ভাল হবে।

খাঁচায় মেঝে সামনের দিকে হাল্কা ঢালু করে তৈরি করা হয় যাতে পাখি খাঁচায় ডিম পাড়লে ডিম গড়িয়ে যেন সামনে চলে আসে।

খাঁচার একপাশে লম্বা ভাবে তৈরি খাবার পাত্র ও পানির পাত্র লাগানো থাকে।

আমাদের দেশে কোয়েলের যে বানিজ্যিক খাঁচা পাওয়া যায় সে সম্পর্কে কিছু তথ্যঃ

  • খাঁচার দৈর্ঘ্যঃ ৬ ফুট
  • খাঁচার প্রস্থঃ ২.৫ ফুট (ভিতরের জায়গা ২ ফুট আর বাইরের সামনের দিকের ডিমের ট্রে ০.৫ ফুট।
  • খাঁচায় তাকের সংখ্যাঃ ৫ টি।
  • প্রতিটি তাকের উচ্চতাঃ ১০-১২ ইঞ্চি
  • প্রতিটি তাকে পাখির রাখা যায়ঃ ১০০ টি।
  • একটা খাঁচায় মোট পাখি রাখা যায়ঃ ৫০০ টি।
  • ৫০০ পাখির খাঁচা তৈরির আনুমানিক খরচঃ ১৪-১৮ হাজার টাকা।

খাঁচায় কোয়েল পালনের সুবিধা

খাঁচায় কোয়েল পালন সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত আর সহজ।

কারন-

  • ডিম গড়িয়ে এসে ট্রে তে জড়ো হয়।ফলে ডিম সংগ্রহ করা সহজ।
  • ডিম ভেঙ্গে যাওয়ার সম্ভাবনা কম।
  • সহজেই খাবার ও পানি দেয়া যায়।
  • পায়খানা বা মল খাঁচার প্রতি তলার নিচে রাখা ট্রে তে পড়ে।ফলে মল বা পায়খানা পরিষ্কার করা অতি সহজ।
  • অল্প জায়গায় একটা খাঁচায় পাঁচ তাক করে ফ্লোরের চেয়ে পাঁচ গুন বেশি পাখি পালা যায়।
  • রোগ বালাই কম হয়।কারন পায়খানা নিয়মিত ট্রে থেকে সরিয়ে নেয়া হয়।
  • খাঁচার নেটের ফাঁকা ছোট হওয়ায় ইঁদুর ঢুকতে পারে না।
  • ঘন ঘন লিটার পরিস্কার করার ঝামেলা থাকে না।
  • খাঁচায় পালন করলে এমোনিয়া গ্যাস হওয়ার সম্ভাবনা নাই।
  • পাখির দৈহিক চাকচিক্য বজায় থাকে।
  • পাখির পালক সহজে পড়ে যায় না।

খাঁচায় কোয়েল পালনের অসুবিধা

খাঁচায় কোয়েল পালনের অসুবিধা নেই বললেই চলে।তবে খাঁচায় পালন করতে হলে কিছু বিষয় আগেই জেনে রাখা উচিত।

যেমন-

  • লোহার খাঁচা তৈরি করতে বেশি মূলধন লাগে।
  • আবার বাঁশের খাঁচা তৈরি করলে বেশিদিন টেকসই হয় না।
  • খাঁচা তৈরির খরচ বাদে ও আবার সেই খাঁচা রাখার জন্য লিটার পদ্ধতির মত একটা সেড তৈরি করা লাগে।ফলে খরচ লাগে বেশি।
  • নিয়মিত খাঁচার মলের বা পায়খানার ট্রে পরিষ্কার না করলে প্রচুর দূর্গন্ধ হয়।

কোন পদ্ধতিতে কোয়েল পালন লাভজনক???

লিটার পদ্ধতিতে কোয়েল পালনের সুবিধা ও অসুবিধা এবং খাঁচায় কোয়েল পালনের সুবিধা ও অসুবিধা জানার পরে এখন সিদ্ধান্ত আপনার।উপরোক্ত সুবিধা অসুবিধা বিবেচনা করেই আপনার সামর্থ্য অনুযায়ী খামার করতে পারেন।

তবে লেখক হিসেবে নয়;একজন খামারী হিসেবে আমি ব্যক্তিগতভাবে আপনাকে পরামর্শ দিব –খাঁচায় কোয়েল পালন করতে। তবে শুরুতে, পরীক্ষামুলকভাবে ৫০০ পাখি লিটারে/ফ্লোরে পালন করে অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের পরেই আপনি যখন বানিজ্যিক আকারে বড় ফার্ম করবেন, কেবলমাত্র তখনি আপনি খাচায় পালনের সিদ্ধান্ত নিবেন। কেননা, শুরুতেই আপনি ৫০০ পাখির জন্য ১৫ হাজার টাকা দিয়ে একটা খাঁচা তৈরি করে শুরু করে দিলেন আর দেখা গেল আপনি এডজাস্ট না করতে পেরে খামার বন্ধ করে দিলেন, তখন আপনার খাঁচা টা ও আপনি কম দামে বিক্রি করে দিতে হবে। তাই আগে খাচায় না করে পরীক্ষামুলকভাবে ফ্লোরে শুরু করুন।

ডাঃ শ্রাবণ হাসান সজল

উদ্যোক্তা,

পোল্ট্রি মাস্টার এন্ড্রয়েড এপ, সোনালি কৃষি ডটকম, ফার্ম টু বাজার ডটকম, ভেট শপ বিডি ডটকম, এগ্রিলাইভ ২৪ ডটকম

Tagged

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *