বানিজ্যিকভাবে ময়ূর পালনে অপার সম্ভাবনা

প্রাণিসম্পদ ময়ূর পালন

ময়ুরের ব্যাপারে আলোচনা করতে গেলে বলতে হয় পৃথিবীর প্রায় সব সভ্যতার ইতিহাসেই ময়ূরের নির্দশন পাওয়া যায়, আমাদের দেশের কবিও লিখেছেন -মেঘ গুরগুর মেঘলা দিনে ময়ূর ডাকে কেকা সবাই লুকায় ঘরের কোনে ময়ূর নাচে একা। কবির লেখা এই দুটি লাইন থেকেই বুঝা যায় মায়ুর কতটা রোমান্টিক পাখি, সত্যিই ময়ুরের মায়াবী ডাক মনে কেড়ে নেয় আমাদের সকলের, পক্ষিকুলের মধ্যে খুব স্ব-শব্দে ডাক দিতে পারে তাদের মধ্যে ময়ুর প্রথম সারিতে আছে।প্রাচিনকালে অভিজাত শ্রেনিতে রসনা-বিলাশের জন্য সুস্বাদু খাদ্যে হিসাবে ময়ূরের মাংশ ও ডিম খাওয়া হত, বর্তমানে একে খাদ্যে গ্রহণ না করা হলেও সুন্দর পালকের জন্য পোল্ট্রি হিসেবে বিবেচনা করা হয়
উড়তে পারে এমন পাখির মধ্যে ময়ুর অন্যতম বৃহত্ব আকৃতির,মেলা অবস্থায় প্রতিটি ডানা ৪.৫ থেকে ৫ ফিট লম্বা হয়।ময়ুর সর্বভূক পাখি, এরা ঘাশ, লতা-পাতা, ফল-মূল, শাপ-গিরগিটি সহ সব ধরনের খাদ্যেই খেয়ে থাকে. ময়ূরীর পেখম নেই কিন্তু ময়ূরের রয়েছে অপূর্ব আকর্ষণীয় পেখম। ময়ূরের সবুজ পেখমের পালকে অনেক রঙীন বড় ফোঁটা থাকে, যা খুবই আকর্ষণীয়। পেখমগুলো লেজের গোড়ার ওপরের পালক, যা অতিমাত্রায় লম্বা। ময়ূরের চূড় আছে। ময়ূর পিঠের ওপর পেখম তুলে ডানা ঝুলিয়ে নেচে নেচে ময়ূরীকে আকর্ষণ করে, যা অত্যন্ত মনোহর ও চিত্তাকর্ষক। এদের দেহে উজ্জ্বল সবুজ ও নীলাভ পালক থাকে। ময়ুরের লেজের রংটি তখনই সবুজ কিংবা নীল দেখায় যখন তা একটি বিশেষ এংগেলে প্রতিফলিত হয়।মাথা, ঘাড়, গলা ও ডানার পালক কিছুটা নীলাভ। ডানার বাকি অংশ ও পা লালচে।

ময়ূরের ব্যাবহার:
ময়ূরের নানা রকম ব্যাবহার থাকলেও এর মধ্যে শখে ময়ুর পালনের কথা আসে সবার আগে, ময়ুরের রং, রূপ, পেথম, ডাক অতন্ত্য আকর্ষনীয়, পৃথিবীতে এমন মানুষ কম খুজে পাওয়া যাবে যে ময়ূরের সাথে সময় কাটাতে ভালোবাসেন না,
ময়ূর শোভাবর্ধনের জন্য ময়ুরের কোর জুড়ি নেই, বাড়ির ছাদে কিংবা আঙ্গিসনায় বাগানের মাঝে কিংবা এক পাশে ময়ুরের খাচা অত্যন্ত্য শোভনীয়, প্রাকিৃতিক অরন্যের একটি টেস্ট নিয়ে আসা যায় বাড়ির মধ্যে।
বানিজ্যিকভাবে ময়ূর পালন করে অনেকেই গড়ে তোলতে আত্ব্যকর্মসংস্থান, এক জোড়া ময়ুর থেকে বছরে পাওয়া যেতে পারে ৪/৫ জোড়া ময়ূর, নি:সন্দেহে ময়ুর অনেক দামী একটি পাথি, সেই জন্য যে কোন আত্ববিশ্বাসীরা ময়ূর পুষে গড়ে তোলতে পারেন নিজ ক্যারিয়ার।
ময়ূরের নানা রকম পালক আছে, এগুলো দিয়ে তৈরী হয় ভেনিটি ব্যাগ, অলংকার-গলার নেকলেস, কানের দুল ফেন্সি পোশাক, টেবিল ম্যাট, ওয়াল ম্যাট, হাত পাখা সহ নানা ধরনের সো-পিছ। ময়ূরের ঝলমলে পালক তৈরী মাছের বরশী মৎস্য শিকারিরা বরাবরই অনেক প্রিয়।
ময়ূরের পালকের তৈরী গ্রাউন পশ্চিমা বিশ্বে হটি কালচার হিসেবে বিভিন্ন ফ্যাশন শো-তে, বিয়ের অনুষ্ঠানে ব্যাবহার করে, এ গুলোর সাথে মেসিং করা ওরনামেন্টও থাকে আর সাথে।

ময়ুরের পা-যের চামড়া দিয়ে তৈরী ঘড়ির বেল্ট, মানি ব্যাগ, চাবির তোড়া যেমনি মজবুত, সুন্দর তেমনি ব্যাবহার করতে অনেক ভালো।

ময়ূর পালন ও পরিচর্যা :
১. ইনকিউবেশন: ইনকিউবেটর মেশিনের সাহায্যে ৯৯-১০০ ডিগ্রি ফা: তাপমাত্রায় ২৮ থেকে ৩০ দিনে , অথবা মুরগির মাধ্যমে প্রাকিৃতিক উপায়ে ইনকিউবেশন বা ডিম তা দেওয়ার পদ্ধতি বিভিন্ন দেশে চর্চা আছে।
২. বাসস্থান:
বাচ্চার বয়স ৪ থেকে ৬ মাস পর্যন্ত কমপক্ষে ৯৫ ডিগ্রি ফারেনহাইটে উষ্ণতার মধ্যে রাখতে রাখতে বাচ্চাগুলেকে একত্রে জড়ো করে রাকতে হবে।
খিলান আকৃতির খাচার উচ্চতা কমপক্ষে ৮ ফুট , প্রন্থ্য ৯-১০ ফুট হওয়া হওয়া উচিৎ, বিশ্রামের জন্য ৫-৬ ফুট উচু মাচাং কিংবা গাছের ডাল দিতে হবে।
কাঠের তৈরী খোয়াড়: কাঠ দিয়ে তৈরী খোয়াড় ময়ূরের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত খোয়াড়টি হতে হবে পরিস্কার, শুষ্ক এবং জীবানুমুক্ত। স্থানের সাপেক্ষে ময়ূরের ঘনত্ব বেশি করবেন না:
৩. খাদ্যে-অভ্যাস:
ময়ূরের খাচায় খাদ্যে এবং পানির পাত্র আলাদা করে দিন, খাদ্যের পাত্র চেইন দিয়ে সিলিং এর সাথে ঝুলিয়ে দিলে ভালো, পানির পাত্রে ১০ থেকে ১৫ লিটার পানি রাখবেন।ময়ূরের বাচ্চার বয়স বাড়ার সাথে তার খাদ্যের মিশ্রনের অনুপাত পরিবর্তন করতে হয়, বাচ্চার বয়স ৬ সপ্তাহ হওয়া পর্যন্ত ধীরে ধীরে প্রোটিনের মাত্রা কমিয়ে পূর্নবয়স্ক ময়ূরের খাদ্যে অভস্ত্য করাতে হয়, আবদ্ধ অবস্থায় লালন-পালনের ক্ষেত্রে এদেরকে নিয়মিত গম, ধান, সবজি, বীজ ইত্যাদি খেতে দিতে হয়। পেঁপে, তরমুজসহ অন্যান্য পাকা ফলও এদের প্রিয় খাদ্য। দৈনিক খাদ্য তালিকা (মাথাপিছু) :শস্যদানা ১৫০ গ্রাম(ধান, গম, ভূট্টা ভাঙ্গা,চিনা বাদাম, কুসুম ফুরের বিচি, সূর্য্মুখি ফুলের বিচি, খোশা সহ মুগ ডাল), টুকরা শাক সবজি ১০০ গ্রাম (লাল শাক/পালং শাক/কলমী শাক), ভাত ৩০০ গ্রাম, প্রানিজ প্রোটিনের জন্য আপনার ময়ূর কে মাথাপিছু ১ টি করে সিদ্ধ ডিম অথবা সমপরিমান গরূ বা খাশির কলিজা দিতে হবে।


আপনার ময়ূরকে মাঝে মাঝে ষ্পেশাল কেয়ার করূন, যেমন মাঝেমাঝে সুস্বাদু ফলমূল, শাকসবজি, মাংশ, পাউরূটি, মেডিকেল চেকআপ, ওষধ খাওয়ানো ইত্যাদি, ময়ূরকে ছোট হাড় কিংবা কাটা দিবেন না, এগুলো গলায় বিধার সম্ভবনা থাকে।
৪. স্বাস্থ্যে: আপনার ময়ুরকে স্বাস্থ্যেবান রাখুন, নিয়মিত এদের স্বাস্থ্যে পরিক্ষা করূন এবং প্রয়োজনে চিকিৎসা করান, যাই হোক সাধারনত ময়ূরকে সুস্থ্যে সর্বপ্রথম আপনার ময়ুরকে উকুনমুক্ত করতে হবে, এবং ‍নিয়মিত (R. D. V) রানীক্ষেত ডিসিজ ভেকসিন দিতে হবে।
ময়ুরের রো্গের একটি তালিকা দেওয়া হল, আশাকরি বিস্তারিত নেটে/আমাদের FB-তে পাবেন।
ক) ভাইরাসজনিত রোগসমূহ (VIRUS AND VIRUS-LIKE DISEASES): নিউক্যাসল ডিজিজ (Newcastle disease (ND), ফাউল পক্স/বসন্ত fowl pox- , হেমোরেজিক এন্টেরাইটিস Hemorrhagic Enteritis (HE)।
খ) ব্যকটেরিয়াজনিত রোগসমূহ (BACTERIAL DISEASES):পুলোরাম ও ফাউল টাইফয়েড Pullorum and Fowl typhoid ,প্যারাটাইফয়েড Paratyphoid , ফাউল কলেরা Fowl Cholera (FC) , এভিয়ান, টিউবারকুলোসিস Avian tuberculosis (TB) , স্ট্যাফাইলোকক্কোসিস Staphylococcus :
গ) প্রোটোজোয়াজনিত রোগসমূহ (PROTOZIAN DISEASES): কক্সিডিওসিস( Coccidiosis ),
হিস্টোমনিয়াসিস Histomoniasis , ট্রাইকোমনিয়াসিস Trichomoniasis : –
ঘ)পুষ্টির অভাবজনিত রোগসমূহ (NUTRITIONAL DISEASES):১: রিকেটস- ক্যালসিয়াম, ফসফরাস এবং ভিটামিন ডি এর অভাবে হয় ( Rickets – Calcium, phosphorus, vitamin D deficiency) ।
১: কার্লড টো প্যারালাইসিস- রাইবোফ্ল্যাভিন এর অভাবে হয়( Curled Toe Paralysis – Riboflavin deficiency )। ৩: নিউট্রিশনাল রূপ- ভিটামিন এ এর অভাবে হয় (Nutritional Roup – Vitamin A deficiency )। ৪: পেরোসিস- ম্যাংগানিজের অভাবে হয় (Perosis – Manganese deficiency) ।.৫: ক্রেজি চিক ডিজিজ- ভিটামিন ই এর অভাবে হয় (Crazy Chick Disease – Vitamin E deficiency; and)।৬: গিজার্ড মায়োপ্যাথি- সেলেনিয়ামের অভাবে হয় Gizzard Myopathy (white muscle disease) – Selenium deficiency ।
খাদ্যের সাথে প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও মিনারে্ল (ইলেক্ট্রলাইট) সরবরাহ করে এ রোগ প্রতিরোধ করা যায়।
ঙ: পরজীবীঘটিত রোগ সমূহ- PARASITES RELATED DESEASES:উকুন Lice: , মাইটস-
এছাড়াও নানা ধরনের ক্রিমি যেমন- Ascaridia, common round worms, Cecal Worms, Heterakis gallinea, Gapeworms, Syngamus trachea, Capillaria worms, Tapeworms, -র ব্যাপারে সাবধান থাকতে হবে।

তথ্যসূত্রঃ সিনান বার্ডস ব্রিডিং ফার্ম,Peacock Society of Bangladesh

Facebook Comments
Tagged

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *