স্ট্রবেরির বানিজ্যিক চাষের আদ্য-পান্ত

আধুনিক কৃষি কৃষি প্রযুক্তি ছাদ কৃষি ফল চাষ

স্ট্রবেরীচাষকৌশল

স্ট্রবেরির_জাত

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ‘বারি স্ট্রবেরি-১’ নামে স্ট্রবেরির একটি উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবন করেছে। জাতটি বাংলাদেশের সবখানেই চাষ করা যায়। নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ে গাছে ফুল আসতে শুরু করে এবং ডিসেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত ফল সংগ্রহ করা যায়। প্রতি গাছে গড়ে ৩২টি ফল ধরে যার গড় ওজন ৪৫০ গ্রাম। হেক্টর প্রতি ফলন ১০-১২ টন। এই জাতের পাকা ফল আকর্ষণীয় টকটকে লাল বর্ণের। জাতটি যথেষ্ঠ পরিমানে সরু লতা ও চারা উৎপাদন করে বলে এর বংশ বিস্তার সহজ।
এছাড়াও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উদ্ভাবিত জাত রাবি-১, রাবি-২, রাবি-৩ এবং মডার্ন হর্টিকালচার সেন্টার, নাটোর থেকে প্রচলিত জাত মডার্ন স্ট্রবেরি-১, মডার্ন স্ট্রবেরি-২, মডার্ন স্ট্রবেরি-৩, মডার্ন স্ট্রবেরি-৪, মডার্ন স্ট্রবেরি-৫; আমাদের দেশে চাষযোগ্য জাত।

উপযুক্তমাটিও_আবহাওয়া

স্ট্রবেরি মূলত মৃদু শীত প্রধান অঞ্চলের ফসল। ফুল ও ফল আসার সময় শুকনো আবহাওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশের আবহাওয়া রবি মৌসুমে স্ট্রবেরি চাষের উপযোগী। উর্বর দোআঁশ থেকে বেলে-দোআঁশ যেসব জমিতে পানি জমে সেখানে স্ট্রবেরি ফলানো যাবে না।

জমিতৈরিচারারোপণ

জমি ভালভাবে চাষ করে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে অন্ততঃ ১ফুট গভীর করে জমি চাষ দিতে হবে। শেষ চাষের সময় পরিমানমতো সার মাটিতে মিশিয়ে দিতে হবে।
স্ট্রবেরির চারা আশ্বিন (মধ্যসেপ্টেম্বর থেকে মধ্যঅক্টোবর) মাসে রোপণের উপযুক্ত সময়।
তবে নভেম্বর-ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত স্ট্রবেরি চারা রোপণ করা যায়।
চারা রোপণের জন্য জমিতে বেড তৈরি করে নিতে হবে।
প্রতিটি বেড প্রায় ৩ ফুট প্রশস্ত করে তৈরি করতে হবে। দুই বেডের মধ্যে ১-১.৫ ফুট চওড়া নালা রাখতে হবে। প্রতিটি বেডে দুই লাইনের মধ্যে ১.৫-২ ফুট দূরত্ব রাখতে হবে। প্রতিটি লাইনে ১-১.৫ ফুট দূরে দূরে চারা রোপণ করতে হবে।
এই হিসেবে প্রতি শতকে প্রায় ১৫০টি চারা রোপণ করা যায়।

সার_প্রয়োগ

ভাল ফলনের জন্য জমিতে পরিমানমতো সার দিতে হবে। মাটি পরীক্ষা করে সার দিলে ফলন ভালো হয়। সাধারণ হিসেবে প্রতি শতক জমিতে শুকনা পঁচা গোবর সার ১২০-১৫০ কেজি।

সেচ

জমিতে রসের অভাব দেখা দিলে প্রয়োজনমতো পানি সেচ দিতে হবে। স্ট্রবেরি জলাবদ্ধতা একদমই সহ্য করতে পারে না। তাই বৃষ্টি বা সেচের অতিরিক্ত পানি দ্রুত বের করে দিতে হবে।

স্ট্রবেরিরচারাউৎপাদন

স্ট্রবেরি রানারের (কচুর লতির মতো লতা) মাধ্যমে বংশবিস্তার করে থাকে।
তাই পূর্ববর্তী বছরের গাছ নষ্ট না করে জমি থেকে তুলে জৈব পদার্থ সমৃদ্ধ হালকা ছায়াযুক্ত স্থানে রোপণ করতে হবে।
ওই গাছ থেকে উৎপন্ন রানারের শিকড় বের হলে তা কেটে ৫০ ভাগ গোবর ও ৫০ ভাগ পলিমাটিযুক্ত পলিথিন ব্যাগে লাগাতে হবে।
এরপর পলিথিন ব্যাগসহ চারাটি হালকা ছায়াযুক্ত স্থানে সংরক্ষণ করতে হবে।
অতিরিক্ত বৃষ্টির হাত থেকে রক্ষার জন্য চারার উপর পলিথিনের ছাউনি দিতে হবে। রানারের মাধ্যমে বংশ বিস্তার করা হলে স্ট্রবেরির ফলন ক্ষমতা ধীরে ধীরে কমতে থাকে।
তাই জাতের ফলন ক্ষমতা অক্ষুন্ন রাথার জন্য টিস্যু কালচারের মাধ্যমে উৎপাদিত চারা ব্যবহার করা ভালো।

অন্যান্য_যত্ন

সরাসরি মাটির সংস্পর্শে আসলে স্ট্রবেরির ফল পচে নষ্ট হয়ে যায়।
এ জন্য চারা রোপণের ২০-২৫দিন পর স্ট্রবেরির বেড খড় বা কালো পলিথিন দিয়ে ঢেকে দিতে হবে।

প্রতি লিটার পানিতে ৩ মিলিলিটার ডার্সবান-২০ ইসি ও ২ গ্রাম ব্যাভিস্টিন ডিএফ মিশিয়ে ওই দ্রবণে খড় শোধন করে নিলে তাতে উঁই পোকার আক্রমণ হয় না এবং দীর্ঘ দিন তা অবিকৃত থাকে।

জমি সব সময় আগাছামুক্ত রাখতে হবে।
গাছ লাগানোর পর তার গোড়া থেকে প্রচুর রানার বা কচুর লতির মতো লতা বের হতে থাকে।
এগুলো জমি ঢেকে ফেলে। এতে ফলন ভাল হয় না। এ জন্য রানারসমূহ ১০-১৫ দিন পর পর কেটে ফেলতে হবে।

রোগবালাইব্যবস্থাপনা

পাতায় দাগ পড়া রোগ
এক ধরণের ছত্রাকের আক্রমণে এই রোগ হয়। এই রোগের আক্রমণে ফলন ও ফলের গুণগত মান কমে যায়।

ফলপচারোগ

এ রোগের আক্রমণে ফলের গায়ে জলে ভেজা বাদামী বা কালো দাগের সৃষ্টি হয়। দাগ দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং ফল খাওয়ার অনুপযোগী হয়ে যায়।

মাকড়

মাকড়ের আক্রমণে স্ট্রবেরির ফলন ক্ষমতা ও গুণগত মান মারত্মকভাবে বিঘিœত হয়। এদের আক্রমণে পাতা তামাটে বর্ণ ধারণ করে ও পুরু হয়ে যায় এবং আস্তে আস্তে কুচকে যায়। গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যবহত হয়।

বুলবুলি পাখি স্ট্রবেরির সবচেয়ে বড় শত্রু। ফল আসার পর সম্পূর্ণ পরিপক্ক হওয়ার আগেই পাখির উপদ্রব শুরু হয়। এজন্য ফল আসার পর সম্পূর্ণ বেড জাল দিয়ে ঢেকে দিতে হবে যাতে পাখি ফল না খেতে পারে।

মাতৃগাছ_রক্ষণাবেক্ষণ

স্ট্রবেরি গাছ প্রখর সূর্যের আলো ও বেশি বৃষ্টি সহ্য করতে পারে না। এজন্য মার্চ-এপ্রিল মাসে হালকা ছায়ার ব্যবস্থা করতে হবে। ফল সংগ্রহের পর সুস্থ-সবল গাছ তুলে পলিথিন ছাউনির নিচে রোপণ করলে

মাতৃগাছকে সূর্যের খরতাপ ও ভারী বৃষ্টির ক্ষতি থেকে রক্ষা করা যায়। মাতৃগাছ থেকে উৎপাদিত রানার পরবর্তী সময়ে চারা হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

ফল_সংগ্রহ

ভাদ্র মাসের মাঝামাঝি (অক্টোবর মাসের শুরু) সময়ে রোপণকৃত বারি স্ট্রবেরি-১ এর ফল সংগ্রহ পৌষ মাসে শুরু হয়ে ফাল্গুন মাস পর্যন্ত চলে। ফল পেকে লাল রঙ হলে ফল সংগ্রহ করতে হয়। স্ট্রবেরির সংরক্ষণকাল খুব কম হওয়ায় ফল সংগ্রহের পর পরই তা টিস্যু পেপার দিয়ে মুড়িয়ে প্লাস্টিকের ঝুড়ি বা ডিমের ট্রেতে এমনভাবে সংরক্ষণ করতে হবে যাতে ফল গাদাগাদি অবস্থায় না থাকে। ফল সংগ্রহের পর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাজারজাত করতে হবে।

কৃষিবিদ মিঠু চন্দ্র অধিকারী

Tagged

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *